আহসান হাবীব’একজন খ্যাতিমান কবি ও সাহিত্যিক।

কবি আহসান হাবীব

আহসান হাবীবএকজন খ্যাতিমান কবি ও সাহিত্যিক। আহসান হাবীবের জন্ম ১৯১৭ সালের ২ জানুয়ারি পিরোজপুরের শংকরপাশা গ্রামে৷ পিতার নাম হামিজুদ্দীন হাওলাদার৷ মাতা জমিলা খাতুন৷ তাঁরা ছিলেন পাঁচ ভাই, চার বোন৷ পিতা মাতার প্রথম সন্তান ছিলেন আহসান হাবীব। পারিবারিক ভাবে তিনি সাহিত্য সংস্কৃতির আবহের মধ্যে বড় হয়েছেন৷ বাড়িতে ছিল আধুনিক সাহিত্যের বইপত্র ও কিছু পুঁথি৷ যেমন আনোয়ারা, মনোয়ারা, মিলন মন্দির প্রভৃতি৷ এসব পড়তে পড়তে একসময় নিজেই কিছু লেখার তাগিদ অনুভব করেন৷

১২/১৩ বছর বয়সে স্কুলে পড়ার সময়ই ১৯৩৩ সালে স্কুল ম্যাগাজিনে তাঁর একটি প্রবন্ধ ‘ধরম’ প্রকাশিত হয়৷ তার পরের বছর পিরোজপুর গভর্নমেন্ট স্কুল ম্যাগাজিনে ছাপা হয় তাঁর প্রথম কবিতা ‘মায়ের কবর পাড়ে কিশোর’ ৷ পরবর্তী সময়ে ছাত্রাবস্থায় কলকাতার কয়েকটি সাহিত্য পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হলে নিজের সম্পর্কে আস্থা বেড়ে যায়৷এরই মধ্যে দেশ, মোহাম্মদী, বিচিত্রার মতো নামি দামি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর বেশ কিছু লেখা।

আহসান হাবীব পিরোজপুর গভর্নমেন্ট স্কুল থেকে ১৯৩৫ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন৷ এরপর তিনি চলে আসেন বরিশালে৷ ভর্তি হন সেখানকার বিখ্যাত বিএম কলেজে৷ বিএম কলেজে দেড় বছর পড়ার পর ১৯৩৬ সালের শেষার্ধে কাজের খোঁজে তিনি কলকাতায় পাড়ি জমান৷

সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিপক্ষে তিনি আমৃত্যু সংগ্রাম করেছেন

বেগম সুফিয়া কামাল

বেগম সুফিয়া কামাল বাংলাদেশের একজন প্রথিতযশা কবি, লেখিকা, নারীবাদী ও নারী আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত। তিনি১৯১১ সালের ২০জুন বরিশালের শায়েস্তাবাদে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার পিতার নাম সৈয়দ আব্দুল বারী। যে সময়ে সুফিয়া কামালের জন্ম তখন বাঙ্গালি মুসলিম নারীদের কাটাতে হত গৃহবন্দি জীবন। স্কুল কলেজে পড়ার কোনো সুযোগ তাদের ছিলো না। পরিবারে বাংলা ভাষার প্রবেশ এক রকম নিষিদ্ধ ছিল।

যে পরিবারে সুফিয়া কামাল জন্মগ্রহণ করেন সেখানে নারীশিক্ষাকে প্রয়োজনীয় মনে করা হতোনা। তিনি তাঁর মা সাবেরা বেগমের কাছে বাংলা পড়তে শেখেন। মাত্র বার বছর বয়সে তাঁকে সৈয়দ নেহাল হোসেনের সাথে বিয়ে দেয়া হয়। নেহাল অপেক্ষাকৃত আধুনিকমনস্ক ছিলেন, তিনি সুফিয়া কামালকে সাহিত্যপাঠে উৎসাহিত করেন। সুফিয়া সে সময়ের বাঙালি সাহিত্যিকদের লেখা পড়তে শুরু করেন। ১৯১৮ সালে কলকাতায় গিয়েছিলেন সুফিয়া কামাল। সেখানে তাঁর সঙ্গে দেখা হয় বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের। সুফিয়া কামালের শিশু মনে বিশেষ জায়গা করে নেয় বেগম রোকেয়ার কথা ও কাজ।

সাহিত্য পাঠের পাশাপাশি সুফিয়া কামাল সাহিত্য রচনা শুরু করেন।১৯২৬ সালে তাঁর প্রথম কবিতা বাসন্তী সেসময়ের প্রভাবশালী সাময়িকী সওগতে প্রকাশিত হয়। ত্রিশের দশকে কলকাতায় অবস্থানকালে বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরতচন্দ্র প্রমুখের দেখা পান তিনি। মুসলিম নারীদের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করার জন্য বেগম রোকেয়ার প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলামে’ রোকেয়ার সঙ্গে সুফিয়া কামালের পরিচয় হয়। বেগম রোকেয়ার চিন্তাধারা ও প্রতিজ্ঞা তাঁর মধ্যেও সঞ্চারিত হয়, যা তাঁর জীবনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে।

বিশ্বনন্দিত পার্থ প্রতিম মজুমদার

পার্থ প্রতিম মজুমদার

সংস্কৃতির প্রতি তাঁর আগ্রহ  ছোটবেলা থেকেই। বাবা ছিলেন একজন সংস্কৃতিমনা প্রেস ফটোগ্রাফার। বাবার সঙ্গে গ্রামের বিভিন্ন অনুষ্ঠান- পার্বণে  লাঠিখেলা, যাত্রা, নাটক, জারিগান এসব দেখে এসে তিনি ভাই-বোনদের সামনে তা উপস্থাপন করতেন। যা দেখতেন তা হুবহু অনুকরণ করতে পারতেন ।কার কথা বলছি? তিনি বিশ্বনন্দিত পার্থ প্রতিম মজুমদার।

পার্থ প্রতিম মজুমদারের জন্ম ১৯৫৪ সালের ১৮ জানুয়ারিতে, পাবনার কালাচাঁদ পাড়ায় ।পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বি্তীয়।বাবার নাম হিমাংশু কুমার বিশ্বাস ও মা সুশ্রিকা বিশ্বাস।জন্মের পর বাবা-মা আদর করে তাঁর নাম রাখেন প্রেমাংশু কুমার বিশ্বাস। প্রথম পড়াশুনা শুরু বাড়ী থেকে খানিক দুরে জুবিলী স্কুলে। তিনি স্কুলে যেতেন বড় ভাই স্নেহাংশু কুমার বিশ্বাসের সঙ্গে।

পার্থ প্রতিম মজুমদার ছোটবেলা থেকেই ছিলেন দুরন্ত। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তাকেঁ পাঠিয়ে দেয়া হয় কাকা শুধাংশু কুমার বিশ্বাসের তত্ত্বাবধানে, কলকাতা শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে চন্দননগরে। সেখানে ড. শীতল প্রসাদ ঘোষ আদর্শ বিদ্যালয়ে পড়ার সময় তাঁর পরিচয় হয় মুকাভিনয় বা মাইমের আর্টিষ্ট যোগেশ দত্তের সঙ্গে । কথা না বলে অভিব্যক্তি প্রকাশ দেখে তিনি তার কাছেই প্রথম মাইম শিখতে আগ্রহী হন।

কণ্ঠশিল্পী বাপ্পা মজুমদারের বাবা, সঙ্গীতগুরু বারিন মজুমদারের সঙ্গে পার্থ প্রতিমের বাবার ছিল মামা-ভাগ্নে সম্পর্ক।তাদের পাবনার বাড়ীতে প্রায়ই আসতেন তিনি।১৯৭২-এ প্রেমাংশু বাড়ী এলে বারীন মজুমদারের নজরে পড়েন। বারীন মজুমদার প্রেমাংশুকে হিমাংশু কুমার বিশ্বাসের কাছ থেকে চেয়ে দত্তক নেন।সেই থেকে তিনি বারিন মজুমদারের ছেলে পার্থ প্রতিম মজুমদার হিসেবে বড় হতে থাকেন।

তালে তালে লাঠিখেলা

লাঠিখেলা চলছে

খবরটি জানাল জিয়নকাঠির বন্ধু জায়েদ। রাজারবাগ পুলিশ লাইন মাঠে হবে লাঠিখেলা। চলছে বৈশাখী মেলা। মেলায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবেই আয়োজন করা হয়েছে ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলার। বাংলাদেশ লাঠিয়াল বাহিনীর কুষ্টিয়া অঞ্চল থেকে আসবে বেশ কয়েকজন লাঠিয়াল সরদার। লাঠিখেলা দেখতে যাওয়ার পরিকল্পনাটিও ঠিক হয় মুঠোফোনে।

২০ এপ্রিল ২০১২। ঘড়ির কাঁটায় সকাল নয়টা ছুঁই ছুঁই। সূর্য তখনো তপ্ত আলো ছড়ায়নি। পুলিশ লাইন মাঠ। এক কোণে লাঠিয়াল বাহিনীর লাঠিয়ালেরা। লাঠিখেলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন সবাই। পোশাক পাল্টে বিশেষ ধরনের পোশাক পরছেন তাঁরা। কেউ কেউ হাতের লাঠিটি ঘুরিয়ে পরখ করে নিচ্ছেন। সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ থেকে আছে তরুণ বয়সী লাঠিয়াল। দু-একজন নারী লাঠিয়ালও এসেছেন।
চোখ যায় মাথায় গামছা বাঁধা তিন যুবকের দিকে। পরনে রঙিন লুঙ্গি ও ধবধবে সাদা গেঞ্জি। দুজনের গলায় ঝুলছে ঢোল ও টরবরি। একজনের হাতে কাঁশি। বাদ্যগুলোতে তাল তোলার চেষ্টা করছেন তাঁরা।
লাঠিয়াল সরদার রবজেল ইসলাম। সত্তরোর্ধ্ব বয়স। কুষ্টিয়ার মিরপুরের কবরবাড়িয়া গ্রামের লাঠিয়াল তিনি। খেলার আগে শিষ্যদের নানা পরামর্শ দিচ্ছেন। কথায় কথায় জানালেন কী কী খেলা দেখানো হবে আজ। তাঁর ভাষায়, ‘একটা হলো নাটির আড়, একটা ছড়ির আড়, একটা জুড়া নাটি, নাটির ফাইটিং, নড়ির আড়, নাটি ঘুরানো, দুই নাটির বাটুল ঘুরানো, দড়ির বাটুল ঘুরানো, ছুড়ার খেলা, কুড়ুল খেলা, চরদখলের খেলা।’
কৃষিকাজের পাশাপাশি লাঠি খেলেন রবজেল সরদার। প্রফুল্ল মনে জানালেন ষষ্ঠ সাফ গেমস ও ভারতের নিখিল বঙ্গ নববর্ষ উৎসব সমিতির আমন্ত্রণে কলকাতার নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে লাঠিখেলার স্মৃতির কথা।
কতজন শিষ্য আপনার?
‘শিষ্য নয়, আমার ছেইলে। নিজের হাতে তৈরি করা ৭০ জন।’
লাঠি তৈরি করেন কীভাবে?
‘নাটি অয় বাঁশের। নাটির যে জায়গাটা ব্যাঁকা, সেই জায়গাটা আগুনে ছ্যাঁক দিয়ে গরম করে চাপন দিতে অয়। এটা তো দশের খেলা। ১০ জনে দেখে। খেলতে আবার আমরা ১০ জন একত্র অই।’

তিরিংদাত হয়ে যায় পাহাড়ি

সোনা সরদারের সংসার

সূর্যটা তখন ডুবুডুবু। আমরা গোলাই গ্রামে। এটি রাজশাহীর গোদাগাড়ির একটি আদিবাসী গ্রাম। পাহাড়িয়া বা পাহাড়িরা গোত্রপ্রধানকে বলে মোড়ল। এখানকার মোড়লের নাম রঘুনাথ সিং। তার সঙ্গে আমরা ঘুরে দেখছি গ্রামটিকে।
গ্রামের অন্যরা এরই মধ্যে  ফিরতে শুরু করেছে। সন্ধ্যের পরেই সভা বসবে। রক্ষাগোলাকে এগিয়ে নেয়ার কৌশল নির্ধারণ হবে আজ। আদিবাসীরা মুষ্টি চালের যে সমিতি তৈরি করেছে তাই রক্ষাগোলা। সবাই আজ বসবে রক্ষা গোলার কার্যালয়েই।
সভা শুরু হতে এখনো অনেক দেরি। এ সুযোগে আমরা আসি মোড়লের বাড়িতে। মাটি আর ছনে ছাওয়া বাড়ির ঘরগুলো। বারান্দায় মাদুর বিছানো বসার জায়গা। বাড়ির ভেতরটা বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। গোয়ালঘরটি শোয়ারঘরের সঙ্গেই। পাশেই রান্নাঘর। মোড়ল জানালেন পাহাড়িদের বাড়িগুলো নাকি এমনটাই হয়।
বাড়ির ঠিক মাঝে কয়েকটা সন্ধ্যাতারা ফুলের গাছ। তাদের মাঝে মাথা তুলে দিয়েছে একটি তুলসি। গাছগুলোর গোড়ার দিকটায় মাটি দিয়ে উঁচু ডিবি তৈরি করা। এটি পাহাড়িয়াদের তুলসি দেবতা। গোড়ার মাটিটা লেপে রাখা হয়েছে। প্রতি সন্ধ্যায় বাড়ির মহিলারা ভক্তি দেয় সেখানে। দেবতা পাহাড়িয়াদের কাছে গোসাইনি। সন্ধ্যায় ভক্তি দেয়াকে এদের ভাষায় ‘কুরিপূজা’ বলে। তখন সন্ধ্যা ছিল। প্রদীপ রেখে, ধূপ জ্বালিয়ে, পানি ছিটিয়ে দেবতার সন্তুষ্টিতে ভক্তি দিচ্ছিল মোড়লের মেয়ে আমতি সিং।
কথায় কথায় মোড়ল বললেন রনজিতের কথা। রক্ষাগোলা রক্ষায় যিনি বিশেষ ভূমিকা রাখছেন। মোড়লের বাড়ির পাশেই তার বাড়ি। আমরা আগ্রহী হতেই মোড়ল নিয়ে যান তার বাড়িতে।
রনজিতের পুরো নাম রনজিত কুমার সরদার। পিতা বিমল চন্দ্র সাওরিয়া আর মা মিনতি রানীর পুত্র রনজিত পড়াশোনা করছেন বাংলায়। অনার্স করছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। অন্যদের নামের শেষে টাইটেল হিসেবে ‘সিং’ শব্দটি ব্যবহৃত হলেও রনজিতের নামের শেষে ‘সরদার’ কেন? এমন প্রশ্নে সে মুচকি হাসে। অতঃপর জানান নানা তথ্য।
এক সময় পাহাড়িয়াদের গোত্র ছিল চারটি। রনজিতের ভাষায়, ‘সাওরিয়া, চেটে, কুমড়ে ও মাল।’ নামের শেষের টাইটেল দিয়েই পাহাড়িয়াদের গোত্রকে বোঝানো হয়। রনজিতের মা ‘চেটে’ আর বাবা ‘সাওরিয়া’ গোত্রের। তাই মায়ের নামের শেষে রানী এবং বাবার নামের শেষে টাইটেল হিসেবে সাওরিয়া ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু সেটিও অনেক আগের রীতি। রনজিত দুঃখের সঙ্গে জানালেন এখন পাহাড়িয়ারা আর আগের টাইটেলগুলো ব্যবহার করে না। বর্তমানে এরা নামের শেষে টাইটেল হিসেবে ‘সরদার’ ও ‘সিং’ শব্দ দুটিই ব্যবহার করে। আদিবাসী নিয়মে পিতার টাইটেল হিসেবে রনজিতের নামের শেষেও ‘সাওরিয়া’ যুক্ত থাকার কথা। কিন্তু সবার মতো তিনিও সরদার ব্যবহার করেছেন।

কোন দেশের জন্য আমরা যুদ্ধ করলাম ?

মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মালেক

‘২৫ মার্চ ১৯৭১। রাত ১ টা। হঠাৎ লাম বেজে ওঠে বগুড়ার পুলিশ ব্যারাকে। ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আক্রমণ হয়েছে। খবরটি ছড়িয়ে পড়ে ব্যারাকে। আমরা সবাই অস্ত্র নিতে চাইলাম। কিন্ত বাধা দিলেন বিহারী এসপি মঈনুদ্দিন। তার কথা কেউ শুনল না। সেই প্রথম চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে গেল। নিজেকে রক্ষায় আমরা অস্ত্রাগার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখলাম। আশপাশের জনতা আমাদের সার্পোট করল। তারা আমাদের খাবার ও খবর দিয়ে সহযোগিতা করতে লাগল।
রংপুর ক্যান্টনমেন্টে ছিল পাকিস্তানী আর্মিদের বড় ঘাটি। এসপির মাধ্যমে তারা প্রথমে আমাদের নিরস্ত্র করার প্রস্তাব দেয়। আমাদের না সুচক জবাব মিলতেই তাদের একটি দল অবস্থান নেয় বগুড়া মহিলা কলেজসহ আশপাশের এলাকায়। ২৮ মার্চ। তাদের ঠেকাতে বগুড়া কটনমিলের পাশে কালিতলায় আমরা পুলিশ জনতা মিলে প্রতিরোধ গড়ে তুললাম। তিনদিন গোলাগুলির পর তারা পিছু হটে। পরে আমরা ৯ মাইল দূরের আর্মিক্যাম্প আক্রমণ করি। পুলিশ ও জনতার আক্রমণের ভয়ে পাকিস্তানীরা সবাই পালিয়ে যায়। সেখানকার অস্ত্রগুলো আমার বিলিয়ে দেই জনতার মাঝে। কিন্ত সে সময়ই আমাদের ওপর বিমান হামলা হয়। আমাদের কিছু লোকও মারা যায়। আমরা এক মেজরকে পরিবারসহ বগুড়ার পুলিশ ব্যারাকে বন্দি করে রাখি।
১৬ এপ্রিল। পাকিস্তানী আর্মিরা চারদিকে থেকে বগুড়া পুলিশ ব্যারাকে আক্রমণের প্রস্তÍতি নিচ্ছে। খবর পেয়ে আমরা একটি দল ভারতের দিকে রওনা হই। এর পূর্বে সুকরানা, পটল, সুরুজের নেতৃত্বে বগুড়ার একটি ব্যাংক ভাঙ্গা হয়। সব টাকা মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের জন্য পাঠিয়ে দেয়া হয় ভারতে। ১৭ বা ১৮ তারিখে হিলি দিয়ে বালুরঘাট হয়ে আমরা চলে আসি ভারতের কুসুমন্ডি থানায়।
কুসুমন্ডি থানায় কেটে যায় বিশটি দিন। কিন্ত এভাবে আর কতদিন বসে থাকা যায়! ইপিআর হাবিলদার কাঞ্চনের উদ্যোগে প্রথমে আমরা নিজেরাই ১০-১৫ জন ট্রেইন সৈন্য নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল গড়ে তুলি। সে দল নিয়ে মাঝে মধ্যে আমরা ভারতের বটতলী থেকে বাংলাদেশ সীমান্তে ঢুকে আক্রমণ চালিয়ে আবার চলে আসতাম। এভাবে যুদ্ধ করি বেশ কিছুদিন!

পাহাড়িয়া গ্রামে রক্ষা গোলা

সুরভী সিং, পাহাড়িয়া সম্প্রদায়ের এক আদিবাসী

চৈত্র মাস। দিনভর গরম। কিন্ত রাতে শীত শীত ভাব। ভোরের দিকে এখনও কুয়াশা পড়ছে। রাজশাহীর আবহাওয়া এর আগে কখনও এমনটা হয়নি। সময়ের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে দেশের আবহাওয়া। বদলে যাচ্ছে প্রকৃতি। প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গে বদলাচ্ছে মানুষের জীবন প্রবাহ।
রাজশাহী এসে আদিবাসী গ্রামের খোঁজ করছিলাম। বন্ধু কাজিমের  উৎসাহে সহজেই মিলে রাজকুমার শাও এর মুঠোফোনের নম্বরটি। তিনি এখানকার আদিবাসী উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক। কাজ করেন আদিবাসীদের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য। মুঠোফোনে তাদের কাজ নিয়ে চলে নানা আলোচনা। কথায় কথায় তার কাছ থেকে জানলাম গোলাই গ্রামটির কথা। সে গ্রামটিতে নাকি পাহাড়িয়া সম্প্রদায়ের ষাটটি আদিবাসী পরিবারের বাস। এই আদিবাসী সম্প্রদায়টিকে অনেকে পাহাড়ি বলেও ডাকে। আমরা যেতে আগ্রহী হই। বন্ধু কাজিম ভালোভাবে জেনে নেয় গোলাই গ্রামে যাওয়ার ঠিকানাটি।
রাজশাহী শহর হতে গোলাই গ্রামটি ১০ কিলো ভেতরে। শহরের রাস্তা ধরে কাশিয়াডাঙ্গা মোড় হয়ে কাকনহাট রোডে পড়বে দামকুড়া হাট। সেটি পেরোলেই  বামদিকের পথ ধরে এগোলে মিলবে ধামিলা গ্রাম। এই ধামিলা গ্রামের পরের গ্রামটিই গোলাই গ্রাম।
গোদাগাড়ি উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের গোলাই গ্রামে যখন আমরা পৌঁছি তখন মধ্য বিকেল। মাটি আর ছনে ছাওয়া  ছোট ছোট ঘর। গরমের মধ্যেও ঘরগুলোতে  শীতল পরিবেশ। একটি ঘরের বারান্দাতে গা এলিয়ে বসে আছে বেশ কয়েকজন বৃদ্ধা। পাশেই সামান্য উঁচুতে রাখা আছে বড় একটি টেলিভিশন। একদল শিশু ও নারী দলভেদে উপভোগ করছে ডিশ বিনোদনের অনুষ্ঠানগুলো।
‘উজান ভাটি’ ছবির গান চলছিল তখন। সবাই একমনে সেদিকে তাকিয়ে। আমরা খানিকটা অবাক হই। হিন্দি সংস্কৃতির আগ্রাসী থাবা থেকে আজ রক্ষায় পায়নি আদিবাসী গ্রামগুলোও।
গ্রামের প্রধান কে? খোঁজ করতেই সাহায্যে এগিয়ে আসে কয়েকজন যুবক। তাদের সঙ্গে আমরা চলে আসি পাহাড়িয়া গ্রামের শেষ প্রান্তের একটি বাড়িতে। বাড়ির ভেতর থেকে বেড়িয়ে আসেন গ্রাম প্রধান। অপরিচিত মুখ দেখে তিনি খানিকটা চিন্তিত।  রাজকুমার শাও এর পরিচয়ের কথা জানতেই তিনি স্বাভাবিক হতে থাকেন।
গ্রাম প্রধানের নাম রঘুনাথ সিং। বয়স ষাটের মতো। পিতা দিয়াঋষি সিং ও মা পদ্যরাণী সিংয়ের আদরের সন্তান রঘুনাথের জন্ম তানোরের কচুয়া গ্রামে। এক সময় সেখানে স্থানীয় বাঙালিদের সঙ্গে জমি নিয়ে চলে নানা বিরোধ। ফলে নিজ জায়গায় টিকতে পারে না রঘুনাথের পরিবার। জীবনের তাগিদে তাই চলে আসেন গোলাই গ্রামের শ্বশুড় বাড়িতে।

মুজিবনগরে গার্ড অব অনারে

লিয়াকত আলী, সিরাজ উদ্দিন ও আজিমুদ্দিন - এই তিনজন মুজিবনগরে গার্ড অব অনার প্রদান করেছিলেন

বৈদ্যনাথতলা থেকে পলাশীর দূরত্ব মাত্র কুড়ি মাইল। ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে অস্তমিত হয়েছিল বাংলার স্বাধীনতার শেষ সূর্যটি। কিন্ত মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননের ইতিহাসটি গৌরবের। ১৭ এপ্রিল ১৯৭১। এখানেই বাংলার স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয়। দেশি-বিদেশি সাংবাদিক ও হাজারো জনতার সামনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ (প্রবাসী) সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিরা শপথ নেয়। সেই থেকে ইতিহাসের হাত ধরে বৈদ্যনাথতলা হয়ে যায় মুজিবনগর।

সূর্যটা তখন হেলে পড়েছে। হালকা আলো এসে পড়েছে ধবধবে সাদা ভাস্কর্যগুলোতে। ভাস্কর্য বা ম্যুরালচিত্রের মাধ্যমে মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সে তুলে ধরা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোকে। সাতই মার্চের ভাষণ, গার্ড অব অনার, মন্ত্রিপরিষদ, সেক্টর কমান্ডারস, মুক্তিযোদ্ধাদের অপারেশন প্রভৃতি এখানে প্রায় জীবন্ত। আম্রকানন আর স্মৃতিসৌধটিও দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে।

সেদিন মুজিবনগর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয় । গার্ড অব অনার প্রদানকারী ১২ জনের মধ্যে বেঁচে আছেন মাত্র চারজন আনসার সদস্য। এক যুবক জানালেন তথ্যটি। ফোন নম্বর দিয়ে সহায়তাও করলেন। মুঠোফোনে তাঁদের সঙ্গে কথা হয়। অতঃপর কেটে যায় মিনিট দশেক সময়। একে একে উপস্থিত হন কালের সাক্ষী চারজন আনসার। মোঃ সিরাজ উদ্দিন ও মোঃ হামিদুল হকের বয়স ষাট পেরোলেও মোঃ আজিমুদ্দিন ও মোঃ লিয়াকত আলীর বয়স সত্তরোর্ধ্ব।

‘২৬ মার্চের পরেই আমরা বৈদ্যনাথতলা ইপিআর ক্যাম্পটি দখলে নিই। ক্যাম্পে ওড়ানো পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে আমরা আগুন ধরিয়ে দেই। এর পর থেকেই ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকি আমরা ১২জন আনসার। সংগ্রাম কমিটির লোকেরা আমাদের চাল-ডাল সংগ্রহ করে দিতেন। আমরা নিজেরাই তা রান্না করে খেতাম।’ এভাবেই কথা শুরু করেন আজিমুদ্দিন শেখ। তিনি ছিলেন ভবরপাড়া গ্রামের সে সময়কার আনসার কমান্ডার।

একজন রাজাকার সব সময়ই রাজাকার

যুদ্ধে যাওয়ার ইচ্ছার কথা শুনে মা হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। ছেলেকে তিনি কিছুতেই ছাড়বেন না। যুদ্ধে গিয়ে কি কেউ জীবন নিয়ে ফিরবে! এই তার ভয়। মা আমাকে চোখে চোখে রাখলেন। যদি পালিয়ে যুদ্ধে চলে যাই। মাকে শান্ত করতে মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দেই। না, কখনোই মুক্তিযুদ্ধে যাব না।
বুড়িতলা আমাদের পাশের গ্রাম। একদিন দিনাজপুর শহর থেকে খানরা ঢুকে পড়ে সে গ্রামে। খানদের ভয়ে গ্রামবাসী লুকায় খেত-খামারে। কাউকে না পেয়ে ক্ষিপ্ত হয় খানপাঞ্জাবিরা। তারা জ্বালিয়ে দেয় গোটা গ্রামটি।
আশপাশের গ্রামের সবাই তখন ভয়ে তটস্থ। অন্যদের সঙ্গে পরিবারসহ আমরাও একদিন উতরাইল গ্রাম ছাড়ি। বনতারা ও খানপারের মাঝামাঝিতে ছিল ভারতীয় সীমান্ত । তা পেরিয়ে আমরা চলে আসি ভারতের ফকিরগঞ্জে। সেখানে এক আত্মীয়র বাড়িতেই আশ্রয় নিই আমরা।
খানিক দীর্ঘশ্বাস। অতঃপর আবার বলতে থাকেন সাদেক আলী।
খানদের ভয়ে দেশ ছেড়ে আমরা ভিন দেশে। এভাবে আর কতদিন? দেশটাকে তো মুক্ত করতে হবে। জানটা না-হয় যাবে। তাতে কি! নানা চিন্তা ঘোরপাক খায় মনে। এভাবে কত দিন বসে থাকব! মনে মনে যুদ্ধে যাওয়ার চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিই। মাকে জানাই না। এক দুপুরে লুকিয়ে বেরিয়ে পরি দেশের টানে। কেউ না জানলেও মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার সব পরিকল্পনার কথা জানতেন আমার বাবা মাঈনুদ্দিন সরকার।
ট্রেনিং শেষে আমরা আসি ৭নং সেক্টরের বড়গ্রাম ক্যাম্পে। আমাদের ছিল ৩৮ জনের একটি দল। কমান্ডার বসাদ মাস্টার। আমাদের নির্দেশনা ছিল হিট এন্ড রান। বড়গ্রাম থেকে আমরা অপারেশন চালাই দাইনর,পাতইলশাহ, হাকিমকুড়ি, বড়গ্রাম, ত্রিশুলা, মোহনপুর এলাকাগুলোতে।
অক্টোবর মাস শেষ প্রায়। যুদ্ধ চলছে পুরোদমে। একটা সাকুর্লার জারি হলো। এখন আর গেরিলা আক্রমণ নয়। ফ্রন্ট ফাইটে যেতে হবে। প্রথম প্রথম কিছুটা ভয় পেতাম। মায়ের কথা খুব মনে পড়ত। আদরের একমাত্র বোন মনোয়ারার কথা মনে হলে বুকটা হু হু করে উঠত।
সাদেক আলী খানিকটা থেমে গম্ভীর কন্ঠে বলতে থাকলেন। তার কথার সুর আমাদের নিয়ে যায় ৪১ বছর আগের ঘটনাগুলোতে।
৬ নভেম্বর ১৯৭১। পরিকল্পনা হয় মোহনপুর ত্রিশুলায় পাকিস্তানি ক্যাম্প আক্রমণের। ইন্ডিয়ান আর্মিসহ আমরা ২০০জন। কমান্ডে ছিলেন ফজলুর রহমান স্যার (যিনি পরবর্তীকালে বিডিআর মহাপরিচালক হয়েছিলেন) এবং ইন্ডিয়ান আর্মির ক্যাপ্টেন এসএস বাট। বড়গ্রাম ক্যাম্প থেকে আমরা বনতারা সীমান্ত দিয়ে ঢুকে পড়ি। পরিকল্পনামতো ফকিরগঞ্জ থেকে ত্রিশুলার দিকে আর্টিলারি সেল চালানো হলো। সে সুযোগে আমরাও অগ্রসর হলাম।
রাত ২টা । ত্রিশুলা ক্যাম্পের চারপাশে আমরা পজিশন নেই। খানরা আমাদের দিকে বৃষ্টির মতো গুলি ছোড়ে। কিন্ত আমাদের চর্তুমুখী আক্রমণের কাছে তারা টিকতে পারে না। ভোরের দিকেই আমরা তাদের ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ নিই। কিন্ত সে অপারেশনে বুকে গুলি লেগে শহীদ হন প্রফুল্ল নামে এক মুক্তিযোদ্ধা। খুব কাছ থেকে দেখেছি তার মৃত্যুযন্ত্রণা। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠেছিল। তখনও জানি না কী অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য!

শুভ নুওবজর

পুরনো বছরকে ফেলে আসে নতুন বছর। আর নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে পাহাড়ের আদিবাসী পল্লীর আদিবাসীরাও মেতে ওঠে উৎসবে। আদিবাসীদের ঘরে নববর্ষের উৎসব বৈসাবি আসে নতুন সাজে। চাকমা সম্প্রদায় এ উৎসবকে বিঝু, মারমারা সাংগ্রাই এবং ত্রিপুরারা বৈসু বা বৈসুক বলে। ত্রিপুরারা বৈসুমা দিনে তাদের বাড়িতে অতিথিদের নানা ধরনের পিঠা, পাচন ও পানীয় দিয়ে আপ্যায়ন করে। ওই দিন ত্রিপুরা ছেলেমেয়েরা নদী থেকে জল এনে তাদের নানা-নানী, দাদা-দাদী স্থানীয় গুরুজনদের স্নান করিয়ে তাদের কাছে আশীর্বাদ গ্রহণ করে। বৈসুর সময় ত্রিপুরা গরাইয়া নাচের শিল্পীরা পাহাড়ি পল্লীর ঘরে ঘরে তাদের ঐতিহ্যবাহী গরাইয়া নৃত্য পরিবেশন করে। চাকমা আদিবাসীরা বাংলা বর্ষের শেষ দিনটিকে মূলবিঝু, তার আগের দিনটিকে ফুলবিঝু এবং নববর্ষের প্রথম দিনটিকে নতুন বছর বা গজ্যাপজ্যা দিন বলে। চাকমারা এ তিন দিন ধরে এ বিঝু উৎসব পালন করে। ফুলবিঝুর দিন তরুণ-তরুণী এবং শিশুরা নদীতে গিয়ে কলাপাতায় করে ফুল ভাসিয়ে দেয়। অনেক ফুল দিয়ে ঘরদোর সাজায়। মূলবিঝু দিনটিই চাকমাদের প্রকৃত বিঝু দিন। এদিন সবার ঘরের দরজা অতিথিদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশাখী উৎসব রাখাইনদের জলকেলি খেলা। নববর্ষ উপলক্ষে আদিবাসী রাখাইনদের প্রধান সামাজিক উৎসব জলকেলি বা সাংগ্রাংয়ের আনন্দ থেকে অনেকে বঞ্চিত হয়, যথাসময়ে উৎসব দেখা হয় না বলে কিংবা উৎসবের তারিখটা জানা থাকে না বলে।

Powered by WordPress | Designed by: free wp themes | Thanks to coupon code and cheap hosting

© 2011 salekkhokon.me All right reserved. | Developed By WebExbd Web Solutions

WebExbd Web Solutions